গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ভারী বর্ষণ হচ্ছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি বায়ু প্রবল থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকেই রাজধানীতে শুরু হয় ভারী বৃষ্টি। তবে এই প্রতিকূল আবহাওয়াও থামাতে পারেনি জীবিকার তাগিদে পথে নামা নিম্ন আয়ের মানুষদের।
রাজধানীর নতুনবাজারের একটি রিকশা গ্যারেজ থেকে ভাড়ায় রিকশা নিয়ে রামপুরা সেতু এলাকায় যাত্রীর অপেক্ষায় ছিলেন ষাটোর্ধ্ব আব্দুল করিম। বৃষ্টিতে পুরোপুরি ভিজে গেলেও থেমে নেই তাঁর সংগ্রাম।
কেন এমন আবহাওয়ায় রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন, জানতে চাইলে আব্দুল করিম বলেন, কিস্তির টাকার চিন্তাই তাঁকে ঘরে থাকতে দেয় না। প্রতিদিন অন্তত পাঁচশ টাকা খরচ হয়। পরিবারের জন্য নিয়মিত টাকা পাঠাতে হয়। কয়েকটি ঋণের কিস্তি মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় দশ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়। জমিজমা বলতে কিছু নেই, তাই প্রতিদিনের আয়ের ওপরই নির্ভর করতে হয়।
তিনি জানান, রিকশা চালিয়ে এক মেয়েকে স্নাতক পর্যন্ত পড়িয়েছেন। আরেক ছেলে এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে।
বড় ছেলে সংসারের দায়িত্ব নিচ্ছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ছেলে চাকরি করলেও নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খায়। মাসে আঠারো হাজার টাকা বেতন পায়, তার মধ্যে আট হাজার টাকা বাসাভাড়া দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত অনেক সময় তাঁকেই ছেলেকে সহায়তা করতে হয়।
নিজের জীবনের দুর্ভাগ্যের কথাও তুলে ধরেন আব্দুল করিম। তিনি বলেন, তাঁদের পরিবারের একসময় ষাট বিঘা জমি ছিল। কিন্তু যমুনা নদীর ভাঙনে সব হারিয়ে আজ জীবিকার জন্য রিকশা চালাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, দুই নাতিকে সঙ্গে নিয়ে ভ্যানে কাঁঠাল বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন সিদ্দিক মিয়া। কাওরান বাজার থেকে সাতশ টাকার কাঁঠাল কিনে এনে বিক্রির চেষ্টা করছেন। বিক্রি না হলে গরুকে খাওয়াতে হবে।
সিদ্দিক মিয়া জানান, তিনি আফতাবনগরে একটি জমির দেখাশোনার কাজ করেন এবং পাশাপাশি গরু পালন করেন। ঋণ নিয়ে দুটি গরু কিনেছেন। প্রতি মাসে সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু চাকরির বেতনে সংসার চালিয়েই কিস্তির টাকা জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। গরু থেকে এখনো তেমন আয় শুরু হয়নি। তাই অতিরিক্ত আয়ের আশায় বৃষ্টির মধ্যেই কাঁঠাল কিনতে বাজারে যেতে হয়েছে। নাতি দুজনও তাঁর সঙ্গে ভ্যানে উঠে বসেছে।
একদিকে ঝুম বৃষ্টির দিনে অনেকের ঘরে আরাম, বিশ্রাম আর পছন্দের খাবারের আয়োজন। অন্যদিকে একই বৃষ্টিকে মাথায় নিয়েই কিস্তির চাপ, ঋণের বোঝা আর সংসারের দায় কাঁধে নিয়ে প্রতিদিন জীবিকার সংগ্রামে নামতে হচ্ছে অসংখ্য নিম্ন আয়ের মানুষকে।

আপনার মতামত লিখুন :