ধামরাই ইউপি নির্বাচন: চেয়ারম্যান প্রার্থীর ছড়াছড়ি, জমে উঠেছে ভোটের লড়াই

লিটন আহমেদ চন্দন , আশুলিয়া প্রতিনিধি(ঢাকা)

প্রকাশিত: ১১ জুলাই, ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম

ধামরাই ইউপি নির্বাচন: চেয়ারম্যান প্রার্থীর ছড়াছড়ি, জমে উঠেছে ভোটের লড়াই

ঐতিহ্যবাহী ধামরাই উপজেলা, যা মৃৎশিল্প ও লোকসংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত, সেখানকার ১৬টি ইউনিয়ন পরিষদে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে এখন নির্বাচনী আমেজ তুঙ্গে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, অক্টোবর ২০২৬ থেকে সারাদেশে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে এবং আগস্টেই তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। ধামরাইয়ে প্রায় দুই বছর ধরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশাসক দ্বারা পরিচালিত হওয়ায়, তৃণমূলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ফিরিয়ে আনার এই নির্বাচনকে স্থানীয়রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।

ধামরাইয়ের গাংগুটিয়া, যাদবপুর, কুল্লা, কুশুরা, রোয়াইল, সানোড়া, সোমভাগ, সূয়াপুর, সূতিপাড়া, চৌহাট, নান্নার, আমতা, বাইশাকান্দা, বালিয়া, ভাড়ারিয়া ও ধামরাই সদর—এই ১৬টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার হিড়িক পড়েছে। দলীয় নেতা, সাবেক মেম্বার, যুব সংগঠনের কর্মী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রবাসফেরত তরুণ—সবাই ইতোমধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। হাট-বাজার, চায়ের দোকান, মসজিদ-মন্দিরের সামনে চলছে গণসংযোগ। পোস্টার, ফেসবুক লাইভ—সব মাধ্যমেই প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। ধামরাই বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, “প্রার্থী ও তাদের লোকজন এখন নিয়মিত আসছেন, কথা বলছেন।”

বর্তমানে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় তাদের সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, এবি পার্টি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের নেতারা ইউনিয়ন পর্যায়ে আগামী চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। যদিও আগামী সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না, তবুও বড় দলগুলো নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে মাঠ গোছাচ্ছে। আগের মতো শুধু প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই নয়, এবার তরুণ-তরুণী, নারী ও পেশাজীবীদের নামও আলোচনায় আসছে। ভোটাররা বলছেন, “মানুষ এবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তা আর দুর্নীতিমুক্ত ইউনিয়ন চায়। যোগ্য হিসেবে যিনি কাজ করবেন, তিনিই ভোট পাবেন।”

ধামরাইয়ের প্রতিটি ইউনিয়নে স্কুল-মাদ্রাসা, হাটবাজার, কমিউনিটি ক্লিনিক, কৃষি, মৃৎশিল্প, পোশাক কারখানা ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল ৫ লক্ষ ১৭ হাজারের বেশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের চাবিকাঠি এখন ইউপি চেয়ারম্যানের হাতে। তাই চেয়ারম্যান পদ মানেই উন্নয়ন বরাদ্দ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, ট্রেড লাইসেন্স-ওয়ারিশ সনদের নিয়ন্ত্রণ—যা প্রার্থীদের আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে।

কথায় আছে, ধামরাইয়ের মাটি বিএনপির ঘাঁটি। বর্তমানে ধামরাই ঢাকা (২০) আসনে দুজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। আলহাজ্ব তমিজ উদ্দিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মনোনয়ন পেয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন এবং তৃণমূলে তাঁর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা রয়েছে। এর পূর্বেও তিনি তিনবার বিপুল ভোটের ব্যবধানে ধামরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংরক্ষিত আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করা হয়েছে। এর পূর্বেও তিনি এই আসনে সংরক্ষিত আসন থেকে সংসদ সদস্য ছিলেন। ধামরাইয়ের ভবিষ্যৎ রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র ও ধামরাইয়ের যুব সমাজের আইকন, সহ-সভাপতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ঢাকা জেলা জাতীয়তাবাদী যুব দলের সভাপতি ইয়াসিন ফেরদৌস মুরাদও নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

বিএনপির এই তিন নেতা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতেই তাঁদের পছন্দের প্রার্থীদের আগামী নির্বাচনে চেয়ারম্যান, মেম্বার বানানোর জন্য নিজেদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় মুখ খুঁজছেন। সঙ্গত কারণেই প্রতিটি ইউনিয়নে বিএনপির দলীয় কমপক্ষে ডজন খানেক চেয়ারম্যান প্রার্থী দেখা যাচ্ছে এবং অনেকের মতে, এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নেতাদের অবৈধ হস্তক্ষেপ হলে অদূর ভবিষ্যতে বিএনপির রাজনীতিতে কালো মেঘ ছেয়ে যেতে পারে। স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বলছেন, বিএনপির মধ্যে ঐক্য না থাকলে প্রতিপক্ষ ফায়দা নেবে।

বাইশাকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের একজন চেয়ারম্যান প্রার্থী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “আমাদের ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী কমপক্ষে ১৫-১৬ জন। বেশি প্রার্থী হলে নির্বাচন উৎসবমুখর ও প্রতিযোগিতামূলক হবে। দলমত নির্বিশেষে সুষ্ঠু নির্বাচন, ভোটারদের নিরাপত্তা আর প্রচার-প্রচারণায় শৃঙ্খলা বজায় রাখাই এখন উপজেলা নির্বাচন কমিশনের বড় পরীক্ষা।”

ধামরাইয়ের ১৬টি ইউনিয়নের সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ঢাকা জেলার মধ্যে ধামরাই উপজেলা উন্নয়নের দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এলাকার উন্নয়নের জন্য দলমত নির্বিশেষে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে তাদের মূল্যবান ভোট দিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করবে।

ধামরাইয়ের ১৬টি ইউনিয়ন জুড়ে এখন নির্বাচনী উৎসবের আমেজ। প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, ওয়াদার পসরা আর চেয়ার দখলের লড়াই—সব মিলিয়ে আগামী ইউপি নির্বাচন ধামরাইয়ের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে। ভোটাররা এখন তাকিয়ে আছেন, শেষ পর্যন্ত কারা জনসেবার প্রত্যয়ে কঠিন সমীকরণের হাজার বছরের হৃদয়ে স্বপ্নের লালিত ভোটযুদ্ধে টিকে যান আর কাদের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।

সিয়াম সরিষা
Link copied!