কারাগারের দেয়াল কখনো কখনো শুধু ইট-সিমেন্টে গড়া থাকে না—সেখানে জমে থাকে মানুষের অশ্রু, দীর্ঘশ্বাস, আর অদেখা-অজানা যন্ত্রণার স্তূপ। বান্দরবান জেলা কারাগারের চিম্বুক ২ নম্বর ওয়ার্ডে ঠিক এমনই এক নীরব আর্তনাদ হয়ে বেঁচে আছেন ৭০ বছর বয়সী অনিল কান্তি শীল (কয়েদি নং– ৮৮৮/২০)। তার দিন শুরু হয় অজানা অপেক্ষায়, শেষ হয় এক অপূর্ণ প্রশ্নে—
আমি কী অপরাধ করেছি?চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়নের এই বৃদ্ধের জীবনের গল্প যেন এক নিঃশব্দ ট্র্যাজেডি। ২০২০ সালে একটি ওয়ারেন্টের কথা বলে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরিবারের ভাষ্য, সেই দিন থেকেই থেমে যায় তার স্বাভাবিক জীবন। প্রথমে চট্টগ্রাম জেলা কারাগার, পরে বান্দরবান—কারাগার বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি তার ভাগ্য। পাঁচ বছর নয়—সাড়ে পাঁচ বছর। একটি দিনও তিনি জানেন না, কেন তিনি বন্দি।অনিলের স্ত্রী তফসী শীল (৫৫) কান্নায় ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলেন,
“আমার স্বামীকে জেলে নেওয়ার পর থেকে আমরা শুধু দৌড়েছি—আদালত, উকিল, কাগজপত্র… কিন্তু কোথাও কিছু নেই। নেই কোনো মামলা, নেই কোনো চার্জশিট, নেই কোনো বিচার। যেন মানুষটা আইনের চোখেই নেই। তবুও তিনি জেলে। তার চোখের জল যেন এক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়— কীভাবে একজন মানুষ এতদিন ‘নথিহীন’ হয়ে বন্দি থাকতে পারেন? মেয়ে জয়া শীলের কণ্ঠে হতাশা আর ভয়ের মিশ্রণ— “আমি জানি না বাবাকে জীবিত ফিরে পাব কি না।
হয়তো একদিন খবর আসবে—বাবা আর নেই। তখন আমরা শুধু লাশটাই পাব… এই ভয় নিয়েই প্রতিদিন বাঁচি। কারাগারের ভেতর থেকেও অনিল কান্তি শীল একই অসহায়তা নিয়ে বলেন, “আমাকে হঠাৎ ধরে নিয়ে গেছে। কী মামলা, কেন মামলা—কিছুই জানি না। এক জেল থেকে আরেক জেলে ঘুরছি। আমার দোষটা কী—কেউ বলে না… কথা বলতে বলতে তার কণ্ঠ থেমে যায়, যেন শব্দেরও শক্তি ফুরিয়ে গেছে।
কারা সূত্র জানায়, বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছে জেল কর্তৃপক্ষও। কিন্তু কোনো নথি না থাকায় এগোনো সম্ভব হয়নি। ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম কারাগার থেকে তাকে বান্দরবানে আনা হয়। এরপর থেকে তিনি এখানেই বন্দি। রেকর্ডে তার মামলা নম্বর হিসেবে লেখা আছে—জি.আর ৬/১৯৮৪ এবং থানচি মামলা নং ১(১২)/৮৪। কিন্তু বাস্তবে সেই মামলার কোনো কার্যকর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি পরিবারের। এদিকে বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই মানুষটি শারীরিকভাবে দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছেন। চিকিৎসা পেলেও তার মানসিক কষ্ট যেন আরও গভীর হয়ে উঠছে—এক অজানা অপরাধের শাস্তি বয়ে বেড়ানোর কষ্ট।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি ঘটনা নয়—এটি বিচারব্যবস্থার ভয়াবহ ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। সংবিধান অনুযায়ী, কাউকে গ্রেপ্তারের পর দ্রুত আদালতে হাজির করা, অভিযোগ স্পষ্ট করা এবং বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করা বাধ্যতামূলক। এর ব্যত্যয় সরাসরি মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
একজন মানুষ—যার শেষ বয়স কাটানোর কথা ছিল পরিবারের স্নেহ-ভালোবাসায়—তিনি আজ বন্দি, কোনো অভিযোগ ছাড়াই, কোনো রায় ছাড়াই। তার প্রতিটি দিন, প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন একটাই প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসে— “আমি কী অপরাধ করেছি?” এই প্রশ্নের উত্তর কি রাষ্ট্র দেবে? নাকি কারাগারের অন্ধকার দেয়ালের আড়ালেই হারিয়ে যাবে এক জীবনের আর্তনাদ? এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা কারাগারের জেলার মনজুরুল ইসলাম বলেন, “আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। বিষয়টি জেনেছি। জেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :