২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বহুল আলোচিত ‘রাতের ভোট’-এ দায়িত্ব পালনকারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পর্যায়ের শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর লক্ষ্যে ফাইল প্রস্তুতের কাজ চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেশের ৬৪ জেলার বিভিন্ন থানা এবং তৎকালীন ছয়টি মহানগর পুলিশের আওতাধীন থানায় দায়িত্ব পালনকারী ওসিদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের বর্তমান কর্মস্থল, পদমর্যাদা, চাকরির অবস্থা এবং প্রশাসনিক অবস্থান যাচাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে শতাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক অবসরসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
সূত্রের ভাষ্য, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুলিশ সদর দপ্তর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিস্তারিত তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তালিকায় বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অবসরে যাওয়া, পদোন্নতি পাওয়া এবং অন্য ইউনিটে কর্মরত কর্মকর্তাদের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী ২০১৮ সালের নির্বাচনে ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ পরিদর্শকদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, ওই সময় দায়িত্ব পালনকারী অনেক ওসি ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন। কেউ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বা সহকারী পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কারও পদোন্নতি দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করার অভিযোগে মাঠপর্যায়ে ওসিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালনকারী ৩৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তাদের অধিকাংশই তখন পুলিশ সুপার বা মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। সরকারি আদেশে জনস্বার্থে অবসরের কথা উল্লেখ করা হলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই নির্বাচনে তাদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার থানা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভূমিকাও পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছে। তবে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কয়েকজন পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে এখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাদের অধিকাংশই বর্তমানে পলাতক।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে গতকাল পর্যন্ত ১২৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ৩৩ জন রয়েছেন। বাকিদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে এবং তাদের চাকরিচ্যুতির কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বর্তমানে কোনো থানায় ওসি পদে দায়িত্ব না দেওয়ার নীতিও অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রধান দায়িত্ব ছিল ওসিদের ওপর। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন পুলিশ সুপার ও পুলিশ কমিশনারদের নির্দেশনায় ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা এবং ব্যালট বাক্স ভর্তি করার কাজে তারা সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন। এ কাজে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের কাছ থেকে পুলিশ সুপার ও পুলিশ কমিশনারদের পাশাপাশি কয়েকজন ওসিও অর্থ নিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০১৮ সালের নির্বাচনের পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করেছিল, ভোটের আগে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়, নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেওয়া হয় এবং ভোটের আগের রাতেই বহু কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়। যদিও তৎকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল, তারপরও ‘রাতের ভোট’ শব্দবন্ধটি দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাতে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরে রাখা হয়। রাত ১০টা থেকে শুরু হয়ে ভোর ৩টা পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই নির্বাচনে ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছিল। এছাড়া ১২২টি কেন্দ্রে ভোটের হার ছিল ৯৯ শতাংশ বা তার বেশি এবং ৭ হাজার ৬৮৯টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছিল ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশের মধ্যে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ভোটারকে ভোটের দিন কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগও তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :