যে ডাক হৃদয়কে বদলে দেয়
জীবনের সব সফরের পরিকল্পনা মানুষ করে না। কিছু সফরের পরিকল্পনা আসে আসমান থেকে, লওহে মাহফুজে লেখা থাকে আমাদের জন্মের আগে থেকেই। আমরা শুধু সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করি। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করছেন, মানুষের ওপর আল্লাহর হক এই যে, সামর্থ্যবান প্রত্যেকে যেন তাঁর ঘরের হজ্জ পালন করে (সূরা আল ইমরান, আয়াত ৯৭)। এই আয়াতের প্রতিধ্বনি আমার বুকের গভীর বহু দিন ধরে বাজছিল, কেবল সময়ের অপেক্ষা ছিল।
২০২৬ সালের এক ব্যস্ত দিন হঠাৎ করেই মনে হলো—যেতে হবে। পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা, দায়িত্ব, হিসাব-নিকাশের বাইরে কোথাও নয়; যেতে হবে সেই পবিত্র ভূমিতে, যেখানে প্রতিটি ধূলিকণা আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাদের পদচারণায় ধন্য হয়েছে। যেতে হবে সেই শহরে, যেখানে বিশ্রাম নিচ্ছেন মানবতার মুক্তিদূত, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সকল কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়তের ওপর। এই কথাটি মনে করতেই সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগেনি। মনে হলো, এই ডাক যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে তাহলে বিলম্ব করা শোভন নয়, কারণ নেক কাজে দ্রুততাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
একজন প্রিয় বন্ধুকে সফরসঙ্গী হিসেবে পেলাম। তাঁর নাম উল্লেখ করছি না, কারণ এই সফরে ব্যক্তি নয়, বন্ধুত্বের আন্তরিকতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই ছিল সবচেয়ে বড় পরিচয়।
বিদায়ের মুহূর্ত
বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে যখন দেশের মানুষের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলাম, তখন বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল। প্রিয়জনদের ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট ছিল, কিন্তু সেই কষ্টকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল আল্লাহর অতিথি হওয়ার আনন্দ। মনে পড়ল, আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের জন্য কুরআনে কত না সুসংবাদের কথা এসেছে— যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ঘরবাড়ি, আত্মীয়স্বজন ছেড়ে বেরিয়ে হয়, আল্লাহ তাদের প্রতিদান কখনো নষ্ট করেন না।
বিমান আকাশে উড়ে যাওয়ার পর জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিলাম— মানুষ আসলে কত ক্ষুদ্র! নিচে ভেসে যাওয়া মেঘের সারি, দূরে বিলীন হয়ে যাওয়া শহরের আলো— সবকিছু যেন এক নীরব সাক্ষ্য দিচ্ছিল আল্লাহর অসীম কুদরতের। আমরা পদ-পদবি, পরিচয়, অর্জন নিয়ে কত গর্ব করি; অথচ কয়েক ঘণ্টার আকাশযাত্রাই বুঝিয়ে দেয়, সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়—আমরা আল্লাহর বান্দা। কুরআন বলছে, মানুষ ও জ্বিন জাতিকে তিনি সৃষ্টি করেছেন কেবল তাঁর ইবাদতের জন্য (সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত ৫৬)। এই সফর যেন সেই মৌলিক পরিচয়ে ফিরে যাওয়ার এক নীরব প্রস্তুতি।
মদিনা: ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মত্যাগের নগরী
মদিনা মুনাওয়ারা ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য ও পবিত্র নগরী। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আগমন করলে এখান থেকেই ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ইসলামী হিজরি সনের সূচনা হয়।
মদিনা শরিফ ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম শহর এবং মসজিদের শহর হিসেবে পরিচিত। মদিনার প্রতিটি মসজিদ ইতিহাসের অমূল্য সাক্ষ্য বহন করে। এর মধ্যে প্রধান আকর্ষণ হলো মসজিদে নববী, যেখানে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারক অবস্থিত। এটি বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের হৃদয়ের স্পন্দন। এখানেই প্রথমবারের মতো 'মদিনা সনদ' স্বাক্ষরিত হয়, যা পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত। এটি বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সহাবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
মদিনায় আরও অনেক ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে। যেমন—মসজিদে কুবা, যেটি ইসলামের ইতিহাসে নির্মিত প্রথম মসজিদ। এখানে দুই রাকাত নামাজ পড়লে একটি ওমরাহ করার সওয়াব পাওয়া যায়।এছাড়া মসজিদে কিবলাতাইন, যেখানে নামাজের সময় কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ এসেছিল; (সুরা আল-বাকারা-১৪৪)।মসজিদে গামামা ও মসজিদে জুমুআহ মদিনার ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ। এই মসজিদগুলো কেবল ইবাদতের স্থান নয়, বরং ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল, যা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের মনকে ঈমানের নূর ও শান্তিতে ভরিয়ে তোলে। এই মসজিদ গুলোর বেশ কয়েকটিতে আমার এই সফরে নামাজ আদায়ের সুযোগ হয়েছে।
ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার জন্য মদিনা থেকে বহু প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ পরিচালিত হয়। মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় মোট ২৭টি গাজওয়া (যেসব যুদ্ধে তিনি নিজে অংশগ্রহণ করেন) এবং প্রায় ৪৭টি সারিয়া (যেসব অভিযানে তিনি প্রতিনিধি প্রেরণ করেন) সংঘটিত হয়। এর মধ্যে বদর, উহুদ এবং খন্দকের যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্লেষণে দেখা যায়, মহানবী (সা.) কখনো যুদ্ধ শুরু করেননি, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠা ও চরম অস্তিত্ব সংকটের মোকাবিলায় নিরুপায় হয়েই সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। মূলত মদিনা ছিল শান্তি ও ন্যায়ের এক আলোকবর্তিকা, আর যুদ্ধসমূহ ছিল সেই শান্তি রক্ষার অনিবার্য প্রক্রিয়া।
মদিনার মানুষের আচরণ ছিল অত্যন্ত উদার, আন্তরিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আনসাররা মক্কা থেকে আগত মুহাজিরদের নিজেদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তাঁদের সঙ্গে সম্পদ, বাসস্থান ও জীবিকা ভাগ করে নেন। এই অনন্য ভ্রাতৃত্ব মানব ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা অনুসরণ করে তারা ন্যায়পরায়ণতা, সহনশীলতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবসেবার মাধ্যমে একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তুলেছিলেন। আমার বিশ্বাস মদিনার মানুষেরা সেই অতীত আচরণগত ঐতিহ্য এখনও বহন করে চলেছে।
মদিনার ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে ঈমান, ঐক্য, ত্যাগ, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজই স্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। তাই মদিনা আজও বিশ্ব মুসলিমের জন্য আদর্শ, অনুপ্রেরণা এবং আত্মিক শান্তির এক চিরন্তন উৎস।
মদিনা— যেখানে হৃদয় শান্তি খুঁজে পায়
দীর্ঘ যাত্রার পর যখন মদিনাতুল মুনাওয়ারার মাটিতে পা রাখলাম, তখন মনে হলো বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া কোনো আপন ঠিকানায় ফিরে এসেছি। মদিনার বাতাসে এক ধরনের প্রশান্তি আছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এখানে কোলাহল আছে, কিন্তু অস্থিরতা নেই; মানুষের ভিড় আছে, কিন্তু বিশৃঙ্খলা নেই। যেন প্রতিটি নিশ্বাসের সঙ্গে দরুদ, প্রতিটি বাতাসের সঙ্গে রহমত মিশে আছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে মদিনাকে ভালোবাসতেন গভীরভাবে। হাদিসে এসেছে, তিনি মদিনা সম্পর্কে বলেছিলেন, এই শহর মানুষের অন্তর থেকে অপবিত্রতা এমনভাবে দূর করে দেয়, যেমন হাপর লোহার মরিচা দূর করে। এই কথাটি বারবার মনে পড়ছিল, কারণ মদিনায় পা রাখার পর থেকেই মনের ভেতরের জড়তা, দুনিয়ার হিসাব-নিকাশ, ক্লান্তি সবকিছু যেন এক অদৃশ্য শক্তিতে ধুয়ে যাচ্ছিল।
এই সেই শহর, যেখানে নির্যাতিত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আশ্রয় দিয়েছিলেন আনসাররা। তাঁরা শুধু একজন মানুষকে আশ্রয় দেননি; তাঁরা মানবতার ভবিষ্যৎকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। আল্লাহ কুরআনে আনসারদের এই আত্মত্যাগের প্রশংসা করে বলেছেন, তাঁরা মুহাজিরদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দিতেন, নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও (সূরা আল-হাশর, আয়াত ৯)। ইতিহাসে এমন আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল।
আজও মদিনাবাসীর আচরণে সেই মহান ঐতিহ্যের প্রতিফলন দেখতে পাই। তাদের আন্তরিকতা, বিনয় ও অতিথিপরায়ণতা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। আমি অন্তর থেকে দোয়া করছি—হে আল্লাহ! যেভাবে তাদের পূর্বপুরুষরা আপনার প্রিয় রাসূল (সা.)-এর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমনি আপনি তাদের উত্তরসূরিদেরও আপনার রহমত ও বরকতে ধন্য করুন।
সবুজ গম্বুজের প্রথম দর্শন
দূর থেকে যখন সবুজ গম্বুজটি চোখে পড়ল, তখন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি, চোখ ভিজে উঠল। কতবার ছবিতে দেখেছি, কতবার ভিডিওতে দেখেছি, কিন্তু বাস্তবে সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতির সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না। মনে হচ্ছিল, শতাব্দীর ব্যবধান মুছে গেছে। ইতিহাস যেন আমার সামনে জীবন্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে পড়ল আল্লাহর সেই ঘোষণা—তিনি নবীর প্রতি ও তাঁর ফেরেশতাগণ দরুদ পাঠ করেন, আর যারা ঈমান এনেছে তাদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নবীর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠাতে (সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৫৬)। সেই মুহূর্তে জিহ্বা যেন আপনা-আপনি দরুদের শব্দমালায় ভরে উঠছিল, থামানো যাচ্ছিল না।
রওজা মোবারকের সামনে
রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম নিবেদন করার মুহূর্তটা আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলোর একটা।
"আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ..."
শব্দগুলো উচ্চারণ করলেও হৃদয়ের ভাষা ছিল আরও গভীর। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলে গেছেন, যে ব্যক্তি তাঁর প্রতি সালাম পাঠায়, আল্লাহ তাঁর রুহ ফিরিয়ে দেন যাতে তিনি সেই সালামের জবাব দিতে পারেন। এই কথা জানার পর থেকে প্রতিটি সালামের শব্দ যেন এক নতুন মাত্রা পেয়েছিল— মনে হচ্ছিল, এই সালাম কোথাও শূন্যতায় হারিয়ে যাচ্ছে না, বরং সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে প্রিয় নবীর কাছে। চোখের অশ্রু যেন অনুশোচনা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার একসঙ্গে প্রকাশ হয়ে উঠছিল। সেই মুহূর্তে পৃথিবীর কোনো চাওয়া-পাওয়া মনে ছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল—হে আল্লাহ! আপনার প্রিয় হাবিবের উম্মত হিসেবে আমাদের জীবন ও মৃত্যু কবুল করুন।
রিয়াদুল জান্নাতে সিজদা
আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে রিয়াদুল জান্নাতে ছয় রাকাত সালাত আদায়ের সুযোগ মিলল। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই বলে গেছেন, তাঁর ঘর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটা জান্নাতের বাগানসমূহের একটা বাগান। সেই বাগানে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করার অনুভূতি এক কথায় অবর্ণনীয়।
সিজদায় মাথা রাখতেই মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমি নিজের জন্য দোয়া করছি, বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করছি, পরিবারের জন্য দোয়া করছি, শিক্ষক, সহকর্মী, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন এবং প্রিয় বাংলাদেশসহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করছি। এমনকি যারা জীবনে আমাকে কষ্ট দিয়েছেন, তাদের জন্যও ক্ষমা চেয়েছি। কুরআনে আল্লাহ মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, তাঁরা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয় (সূরা আল ইমরান, আয়াত ১৩৪)। সেই মুহূর্তে অনুভব করলাম মদিনা মানুষকে প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা করতে শেখায়।
মদিনা ছাড়ার বেদনা
মদিনা ছাড়ার দিনটি ছিল এই সফরের সবচেয়ে কঠিন দিন। বারবার সবুজ গম্বুজের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, হৃদয়ের একটা অংশ এখানেই রেখে যাচ্ছি। মানুষ হয়তো শরীর নিয়ে ফিরে আসে, কিন্তু তার আত্মার এক টুকরো চিরকাল মদিনায় থেকে যায়। মসজিদে নববীর আজানের ধ্বনি এখনও কানে ভেসে আসছিল, যেন সেই ধ্বনি আমাকে বলছিল—আবার ফিরে এসো। যোহরের নামাজ শেষ করে এহরাম পড়ে নিলাম।
মদিনা থেকে মক্কার পথে: এক নতুন সত্তার সন্ধানে
মদিনার মায়াবী পরিবেশ পেছনে ফেলে এখন মক্কার পথে—ট্রেনের জানালায় দ্রুত ধাবমান মরুভূমির দিগন্তের চেয়েও দ্রুতগতিতে হৃদয়ে ধ্বনিত হচ্ছে সেই চিরচেনা তালবিয়ার সুর—‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক...’।
স্মৃতির পাতায় চোখ বুজে আজ উপলব্ধি করছি, এই সফর কেবল ভৌগোলিক কোনো দূরত্ব অতিক্রম করা ছিল না; এটি ছিল নিজের ভেতরের মানুষটিকে নতুন করে আবিষ্কারের এক অসাধারণ যাত্রা। কর্মময় জীবনের কোলাহল আর পেশাগত কঠোরতার আড়াল থেকে বেরিয়ে নিজের আত্মার আয়নায় নিজেকে দেখার এ এক দুর্লভ সুযোগ।
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সেই অমোঘ বাণী আজ হৃদয়ে অন্যরকম দ্যোতনা ছড়াচ্ছে—‘যে ব্যক্তি হজ্জ বা উমরাহ করতে গিয়ে অশ্লীল কথাবার্তা ও পাপাচার থেকে বিরত থাকে, সে যেন সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে।’ এই সফরের প্রকৃত মাহাত্ম্য বোধহয় এখানেই—কেবল এক ভূখণ্ড থেকে অন্য ভূখণ্ডে পাড়ি জমানো নয়, বরং পুরোনো এক ‘আমি’-কে ঝেড়ে ফেলে নতুন এক সত্তা নিয়ে জেগে ওঠার নামই হজ্জ বা উমরাহ।
আল্লাহর দরবারে আজকের এই বিমুগ্ধ লগ্নে একটাই প্রার্থনা—হে পরম করুণাময়! আপনি আমাদের যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দিন। আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন। আমাদের পিতা-মাতা, পরিবার, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক, বন্ধু-সহকর্মী এবং সমগ্র মানবজাতির ওপর আপনার অফুরান রহমত বর্ষণ করুন। আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর শাফায়াত যেন কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে আমাদের নসিব হয়।আর যদি আপনার অশেষ দয়ায় এই ক্ষুদ্র বান্দার ডাক আবারো সেই পবিত্র ভূমিতে আসে, তবে পরম ব্যাকুলতায় যেন পুনরায় বলতে পারি—
‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।’
আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন।
—লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অতিরিক্ত আইজিপি (অব.)

আপনার মতামত লিখুন :