জুলাইয়ে রামপুরায় ২৩ জন ছাত্রজনতাকে গুলি করে হত্যার নির্দেশদাতা সেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এখন আশুগঞ্জের ইউএনও!

রেজাউল করিম রেজা , বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম

জুলাইয়ে রামপুরায় ২৩ জন ছাত্রজনতাকে গুলি করে হত্যার নির্দেশদাতা সেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এখন আশুগঞ্জের ইউএনও!

ফাইল ফটো

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান দমাতে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গুলির নির্দেশ দেওয়া বিতর্কিত সেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও হিসেবে কর্মরত রাফে মোহাম্মদ ছড়া। তিনি এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। যাদের বিচারের আওতায় আনার কথা ছিল, উল্টো তিনি এখনও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় ইউএনও হিসাবে বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে।  

 জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের সূত্র থেকে প্রাপ্ত ৯৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তালিকা এবং তাদের বর্তমান পদায়ন বিশ্লেষণ করে এই চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের সময় মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা এসব কর্মকর্তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলির নির্দেশ দেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা অনেকেই গ্রেফতার হলেও বহাল তবিয়তে রয়ে যাচ্ছে গুলির নির্দেশতারা। এমনই একজন আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা  রাফে মোহাম্মদ ছড়া।  শুধু তিনি এখানেই আলোচনায় নয় এবার বহু আলোচনায় 

 মেঘনা নদীতে বালু ডাকাতির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন জুলাই, ২৪ এর ঢাকার রামপুরায় ২৩ জন ছাত্রজনতা হত্যার খুনের নির্দেশদাতা আশুগঞ্জের ইউএনও রাফে মোহাম্মদ ছড়া। ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে সরকারের। আর বসতভিটা হারাচ্ছেন হাজার হাজার সংখ্যা সংখ্যা লঘু পরিবার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শেখ হাসিনার পতনের আগে জুলাইয়ের ক্র্যাকডাউন সফল করতে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত অথবা তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের অনুগত কর্মকর্তাদের অনেকেই ছিলেন বেপরোয়া। তাদের বেশির ভাগকে বাছাই করে আন্দোলন দমনে মাঠে নামানো হয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থার ‘ইতিবাচক’ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এসব বিশেষ কর্মকর্তাকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে রাস্তায় নামায় তৎকালীন সরকার। 

তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর তাদের অনেকেই রাতারাতি খোলস বদলে বর্তমান সরকারের আমলেও প্রভাবশালী বিভিন্ন পদে জায়গা করে নিয়েছেন।

এদিকে বিচারের পরিবর্তে এমন পুরস্কারপ্রাপ্তি পদায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা আন্দোলনকারী ও তাদের স্বজনরা। তারা দ্রুত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক, একই সঙ্গে উদ্বেগজনক। জুলাইয়ে আন্দোলনকারীদের গুলি করার নির্দেশ যাঁরা দিয়েছেন, তাঁদের তো বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁরা এখন ভালো ভালো পদে বসে আছেন। এমননি একজন রাফে মোহাম্মদ ছড়া। তিনি আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে কর্মরত। এবিষয়ে 

সরকারকে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে আমলাতন্ত্রসহ প্রশাসনের যাঁরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় অন্যায় কাজে জড়িত ছিলেন, তদন্তের মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে দোষীদের বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় এমন বিচারহীনতার সংস্কৃতি আবারও ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটাবে।’

নিকারুজ্জামান (তালিকার ৫৭ নম্বর)। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই উপসচিব ২০, ২১, ২৩, ২৬, ২৭ ও ৩০ জুলাই রামপুরাসহ বিভিন্ন সহিংস এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর বাবা চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ছোট ভাই দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এর আগে কক্সবাজারের উখিয়ার ইউএনও থাকাকালে বিতর্কিত ‘রাতের ভোটে’ সহায়তার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এস এম মুনিম লিংকন (তালিকার ৭৭ নম্বর) ও মো. আক্তারুজ্জামান (তালিকার ৮৫ নম্বর)। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই দুই সিনিয়র সহকারী সচিব যথাক্রমে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ এবং ১ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন। মোছা. আকলিমা বেগম (তালিকার ১ নম্বর)। আন্দোলনের সময় ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার থাকা এই কর্মকর্তাকে ৫ আগস্টের পর কৌশলগত কারণে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে বদলি করা হয়। সম্প্রতি তাঁকে সচিবালয়ে পদায়ন করা হয়েছে।

মইন উদ্দিন ইকবাল (তালিকার ৬০ নম্বর) ও আলমগীর কবীর (তালিকার ৫৫ নম্বর)। এই দুই উপসচিব যথাক্রমে ৪ আগস্ট ঢাকা এবং হানিফ ফ্লাইওভার ও শনির আখড়ার মতো তীব্র সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে দুজনই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বহাল আছেন।

বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হককে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রামপুরা টিভি ভবন এলাকায় নির্বিচারে ২৭৯ রাউন্ড গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া ঢাকা ডিসি কার্যালয়ের বিতর্কিত সহকারী কমিশনার সায়েম ইমরান বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে কর্মরত। সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি অবস্থান বদলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে সচিবালয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

সচিবালয়ের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী মন্ত্রণালয়েও এই তালিকার একাধিক কর্মকর্তা প্রেষণে বা পদায়নে বহাল রয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন তিনজন বিতর্কিত কর্মকর্তা। এর মধ্যে তালিকার ৫৩ নম্বরে থাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব স্নেহাশীষ দাশ ১ থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় এবং ৬৮ নম্বরে থাকা উপসচিব সুজিৎ দেবনাথ ২০ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তালিকার ৮৪ নম্বরে থাকা খন্দকার রবিউল ইসলাম ২০ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও দায়িত্বে রয়েছেন দুই বিতর্কিত কর্মকর্তা। নতুন পদায়ন হওয়া বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খানের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন শেখ শামসুল আরেফিন (তালিকার ৮০ নম্বর), যিনি ৪ ও ৫ আগস্ট ইসিবি চত্বর এবং রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় গুলির নির্দেশদাতার দায়িত্বে ছিলেন। একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মেহেদী হাসান (তালিকার ৪৮ নম্বর) ২০ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্ব পালন করেন।

অর্থ বিভাগেও পুনর্বাসিত হয়েছেন তালিকাভুক্ত তিন কর্মকর্তা। এর মধ্যে সিনিয়র সহকারী সচিব সৈয়দ আশরাফুজ্জামান (তালিকার ৭৬ নম্বর) ২০ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত এবং সিনিয়র সহকারী সচিব দেবাংশু কুমার সিংহ (তালিকার ৬৪ নম্বর) ১ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্বরত ছিলেন। এ ছাড়া অর্থ বিভাগের উপসচিব মাসুদ রানা (তালিকার ৬১ নম্বর) ৪ ও ৫ আগস্ট মতিঝিল এবং হানিফ ফ্লাইওভার এলাকায় সংঘাতের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মাঠে দায়িত্ব পালন করে। 

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মোট ৫১ জন কর্মকর্তা সরাসরি মাঠে নিয়োজিত ছিলেন। সরকার পতনের পর তাঁদের অনেককে ঢাকার বাইরে বদলি করা হলেও এখনো তাঁরা ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত পদে (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)) হিসেবে বহাল রয়েছেন।

তাঁদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ,  মৌসুমী নাসরিন (মানিকগঞ্জ সদর), উমর ফারুক (কেরানীগঞ্জ, ঢাকা) এবং মনিষা রানী কর্মকার (শিবালয়, মানিকগঞ্জ)। আর সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত আছেন সাদিয়া আক্তার (নারায়ণগঞ্জ সদর), আসিফ রহমান (নবাবগঞ্জ, ঢাকা) এবং শাইখা সুলতানা (শিবচর, মাদারীপুর)। এ ছাড়া পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছেন আবদুল্লাহ আল রনী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মামুন এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বহাল আছেন শরীফ মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন ও নুসরাত নওশীন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাফে মোহাম্মদ ছড়া বলেন, “ঘটনার সময় আমি ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত ছিলাম এবং সেদিন রাতে ডিউটির দায়িত্বে ছিলাম। ওই রাতে কোনো ধরনের ঘটনা ঘটেনি। বিষয়টির সাক্ষী হিসেবে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারাও রয়েছেন। প্রয়োজনে প্রযুক্তিগতভাবে বিষয়টি যাচাই করে এরপর সংবাদ প্রকাশ করলে ভালো হবে।”

সিয়াম সরিষা
Link copied!