পরিচয় আড়াল করে নতুন কৌশলে মাঠে আওয়ামী লীগ

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম

পরিচয় আড়াল করে নতুন কৌশলে মাঠে আওয়ামী লীগ

ফাইল ফটো

দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিচয় গোপন করে আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী নতুন কৌশলে সক্রিয় হয়ে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে বিভিন্ন মামলার বাদী হচ্ছেন, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আদালত ও থানায় মামলা দায়ের করছেন। একই সঙ্গে কিছু কথিত সাংবাদিক আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় সরাসরি সহায়তা করছে। 

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৮ জুলাই ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের নেতা মো. শহিদুল ইসলাম ময়মনসিংহের সিনিয়র সাংবাদিক মো. খায়রুল আলম রফিকের বিরুদ্ধে ঢাকার পল্টন আদালতে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে পল্টন থানায় মামলা (মামলা নং-৭, তারিখ: ০৮/০৭/২০২৬) রুজু হয়। 

বিষয়টি জানতে পেরে ১৪ জুলাই সাংবাদিক মোঃ খায়রুল আলম রফিক আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর ঘটনাটি সাংবাদিক মহলে আলোচনার সৃষ্টি করে।

ময়মনসিংহের সাবেক ছাত্রদল নেতা রেজাউল করিম রেজা অভিযোগ করেন, ২৩ জুলাই ২০১৭ সালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সাবেক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তাঁর পরিবারকে নিয়ে অশ্লীল ও মানহানিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে মো. শহিদুল ইসলামসহ প্রায় ১৫০-১৬০ জন অংশ নেন। 

এ ঘটনায় তিনি ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ আদালতে একটি মানহানির মামলা (নং-৭৫৪/২৫) দায়ের করেন। পরে তদন্ত শেষে গত ৫/০৩/২৬ ইং তারিখ ময়মনসিংহের পিবিআই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করলে আদালত মোঃ শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহের আদালত পুলিশ পরিদর্শক।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির নেতা সাইদুর রহমান মিঠু অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারকে নিয়ে কটূক্তির মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও শহিদুল ইসলাম বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন এবং নিয়মিত বিভিন্ন আদালত ও থানায় বাদী হিসেবে মামলা করছেন। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগের একটি প্রভাবশালী চক্র এ ধরনের ব্যক্তিদের সহায়তা করছে, যা তদন্তের দাবি রাখে। তিনি আরও বলেন, শহিদুল ইসলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার পরেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। এটি কিভাবে সম্ভব?  এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ওসির বক্তব্য জানতে বারবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। 

এদিকে, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার শিকির বাজার স্কাউট ভবন থেকে পূর্ব চিত্রাপাড়া পর্যন্ত সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজে অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করেন দৈনিক আমার দেশ-এর কোটালীপাড়া প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল। পরে তাঁর বিরুদ্ধে গত ৭ জুলাই গোপালগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা করেন আওয়ামী লীগ নেতা ও মেসার্স জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের প্রতিনিধি ইয়াসিন হোসেন। তিনি বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার ২ নং কলাতলা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি। 

অভিযোগ রয়েছে, মামলার বাদী প্রকাশ্যে ঠিকাদারি কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি পুলিশ। অভিযোগকারীদের দাবি, গোপালগঞ্জ ও ডিএমপিসহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন মামলার বাদী হচ্ছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সুবিধাও পাচ্ছেন। 

একই সঙ্গে একটি অংশ সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে অনলাইন সংবাদমাধ্যম বা কথিত ভুয়া অনলাইন পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অভিযোগে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতা শহিদুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি ‘সমাজের আলো’ নামে একটি অনলাইন পোর্টালের সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের সাংগঠনিক তৎপরতায় সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করলেও সংস্থাটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাংবাদিকতার পরিচয় বা অন্য কোনো পেশাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে, প্রমাণ সাপেক্ষে প্রচলিত আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

ফরিদপুর জেলা পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী জানিয়েছেন, ভাংগা থানা আওয়ামী লীগের নেতা মোঃ শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে দুটি মামলার কপি পুলিশের হাতে এসেছে। দুটি তদন্ত চলছে। প্রমাণিত হলেও তাকে গ্রেফতার করা হবে। 

গোপালগঞ্জের জেলা পুলিশ সুপার মোঃ হাবিবুল্লাহ জানান, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার সব সময়ই হচ্ছে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে এসেছে  বাগেরহাট চিতলমারী কলাতলা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইয়াসিন ফকির গোপালগঞ্জে আছেন। আমি ওসি কে নির্দেশ দিয়েছি তাকে গ্রেপ্তার করতে।

সিয়াম সরিষা
Link copied!