সালথায় মানবপাচার চক্রের ফাঁসি ও টাকা ফেরতের দাবিতে মানববন্ধন

মোঃ পারভেজ মিয়া , সালথা (ফরিদপুর) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০৮:২২ পিএম

সালথায় মানবপাচার চক্রের ফাঁসি ও টাকা ফেরতের দাবিতে মানববন্ধন

উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন, অতঃপর লিবিয়ার টর্চার সেলে জিম্মি করে লোমহর্ষক নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে। এই চক্রের মূলহোতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরতের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফরিদপুরের সালথা।

উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বড় বাহিরদিয়া পশ্চিমপাড়া এলাকায় ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় এলাকাবাসীর উদ্যোগে এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, বড় বাহিরদিয়া গ্রামের মতি মোল্লার দুই ছেলে হেমায়েত মোল্লা (৩৮) ও সাজ্জাদ মোল্লা (৩৩) দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মানবপাচারের জাল বিছিয়ে রেখেছেন। ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে স্থানীয় অন্তত ৮ থেকে ১০টি সরলমনা পরিবারের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তারা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সাজ্জাদ মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ায় অবস্থান করে আন্তর্জাতিক মাফিয়া ও মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আর দেশে অবস্থান করে তার বড় ভাই হেমায়েত মোল্লা লিবিয়া হয়ে ইতালি গমনেচ্ছুকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতেন। দুই ভাইয়ের এই সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে বড় বাহিরদিয়া এলাকার বহু পরিবার আজ নিঃস্ব।

মানববন্ধনে উপস্থিত হয়ে নির্যাতনের শিকার শরিফুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন: "হেমায়েত মোল্যা নানা আশ্বাস দিয়ে আমাকে লিবিয়ায় পাঠায়। সেখানে পৌঁছানোর পর আমাকে তার ভাই সাজ্জাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সাজ্জাদ আমাকে ১৫-২০ দিন একটি গোপন আস্তানায় আটকে রেখে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের চোটে আমি প্রায় দেড় মাস বিছানায় পড়ে ছিলাম। পরে আমাকে সেখানকার একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। জিম্মি অবস্থায় আমার কাছ থেকে নগদ ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা কেড়ে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে আমার ও আমার দুই ভাইয়ের কাছ থেকে প্রায় ১৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। আমি আমার কষ্টার্জিত টাকা ফেরত চাই এবং হেমায়েত মোল্যার ফাঁসি দাবি করছি।"

আরেক ভুক্তভোগী মোহাম্মদ মুক্তার বলেন, "আমার ছেলে ও ভাতিজাকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে হেমায়েতকে সাড়ে ১৮ লাখ টাকা দিই। কিন্তু ইতালিতে না পাঠিয়ে লিবিয়ায় আটকে রেখে ওদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। আমরা যখন হেমায়েতদের কাছে এর প্রতিবাদ করি এবং বলি হয় ইতালি পাঠান, না হয় দেশে ফিরিয়ে আনুন—তখন লিবিয়া থেকে সাজ্জাদ আমাদের হুমকি দিয়ে বলে, 'তোদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে কে?' তখনই আমরা বুঝতে পারি বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছি।"

স্বজনদের দাবি, লিবিয়ায় জিম্মি থাকা বেশ কয়েকজনের কোনো খোঁজ এখনও পাওয়া যাচ্ছে না, যার ফলে পরিবারগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এছাড়া অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় মামলা বা মুখ খুললে ভুক্তভোগীদের নানা ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও মানববন্ধনে অভিযোগ করা হয়।

যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত হেমায়েত মোল্লা তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। গ্রাম্য বিরোধের জের ধরে একটি মহল আমাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। এর আগে গত ১৭ জুলাই আমরা একটি সত্য মানববন্ধন করেছিলাম, তারই কাউন্টার হিসেবে ওরা এই মানববন্ধন করছে।"

এ বিষয়ে সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবলুর রহমান খান বলেন, "বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত থানায় কেউ কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

সিয়াম সরিষা
Link copied!