গাজীপুরে স্ত্রী হত্যা, ৪৮ ঘণ্টায় পিবিআইয়ের জালে স্বামী

আখতার হোসেন , বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ০৮:০০ পিএম

গাজীপুরে স্ত্রী হত্যা, ৪৮ ঘণ্টায় পিবিআইয়ের জালে স্বামী

ফাইল ফটো

গাজীপুর মহানগরের বাসন থানার পালেরপাড়া এলাকায় পারিবারিক কলহের জেরে পোশাক শ্রমিক মিম আক্তারকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি ও নিহতের স্বামী মো. আলম হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, পিবিআই গাজীপুর জেলা।  হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বৃহস্পতিবার (৩০জুলাই) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বরিশাল মহানগরের কোতোয়ালি থানাধীন লঞ্চঘাট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সন্ধ্যায় গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার ও পিবিআই গাজীপুর জেলার ইউনিট ইনচার্জ মো. রকিবুল আক্তার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।  তিনি বলেন, হত্যার পর আলম হোসেন গাজীপুর থেকে পালিয়ে বরিশাল লঞ্চঘাট ব্যবহার করে অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তার অবস্থান শনাক্ত করে পিবিআইয়ের তদন্ত দল তাকে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তার আলম হোসেন (২৯) ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার মোকামিয়া গ্রামের মৃত লতিফের ছেলে। স্ত্রী ও তিন বছর বয়সী মেরাজকে নিয়ে তিনি গাজীপুর মহানগরের বাসন থানাধীন পালেরপাড়া এলাকায় আরজু মিয়ার বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন। নিহত মিম আক্তার, ২৮, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার মাঝিয়াইল গ্রামের মো. জয়নাল আবেদীনের মেয়ে। তিনি একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। প্রায় ছয় বছর আগে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী আলম হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

মামলার এজাহার ও পিবিআইয়ের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, গত ২৫ জুলাই মিম তার বেতনের ৫হাজার টাকা বাসার ড্রয়ারে রাখেন। অভিযোগ রয়েছে, ২৭ জুলাই রাত ৯টার দিকে আলম স্ত্রীকে না জানিয়ে ওই টাকা নিয়ে জুয়া খেলে হারিয়ে ফেলেন। রাত পৌনে ১০টার দিকে মিম ওষুধ কেনার জন্য ড্রয়ারে টাকা খুঁজে না পেয়ে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করেন। আলম টাকা নিয়ে জুয়া খেলার কথা স্বীকার করলে তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে মিমকে গালিগালাজ ও মারধর করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

স্বামীর ভয়ে মিম একই এলাকায় বসবাসকারী তার বোন মোসা. লাকীর বাসায় আশ্রয় নেন। পরে রাত ১১টার দিকে আলম হোসেন ও তার মা মোসা. জাহানারা বেগম সেখানে গিয়ে মিমকে আবার তাদের ভাড়া বাসায় ফিরিয়ে আনেন। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাত ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে মিম ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তাকে ধারালো দা দিয়ে উপর্যুপরি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। তার মাথা, কপাল, মুখমণ্ডল, বুক, পেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত পাওয়া যায়। পরে গলা কেটে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভোরে খবর পেয়ে নিহতের ভাই মো. শহীদুল ইসলাম ওরফে রানা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশকে জানান। পরে বাসন থানা পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে আলম হোসেন ও তার মা মোসা. জাহানারা বেগমকে আসামি করে বাসন থানায় হত্যা মামলা করেন।

হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই পিবিআই গাজীপুর জেলার ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ ও ছায়া তদন্ত শুরু করে। মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় ৩০ জুলাই সংস্থাটি স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে। পুলিশ পরিদর্শক মো. রাফিকুল ইসলাম জামানকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের দিকনির্দেশনা এবং পিবিআই গাজীপুর জেলার ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে একাধিক দল প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারে মাঠে নামে।

পিবিআই জানায়, তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত সহযোগিতায় আলম হোসেনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে বরিশাল লঞ্চঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে জানা গেছে, আলম হোসেন পেশায় অটোরিকশাচালক। কোমরের হাড়ের সমস্যার কারণে তিনি নিয়মিত অটোরিকশা চালাতে পারতেন না। ফলে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট চলছিল। তার মা মাঝেমধ্যে ভিক্ষা করে টাকা এনে সংসারে সহায়তা করতেন।

পিবিআইয়ের দাবি, আলম হোসেন মাদকাসক্ত ও জুয়ায় অভ্যস্ত ছিলেন। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, মাদক ও জুয়ার আসক্তি ও দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ থেকেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, “হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পাওয়ার পরপরই ক্রাইমসিন টিমকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে আরেকটি দলকে ছায়া তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পিবিআই প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় আমাদের দল বিরামহীনভাবে কাজ করেছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাত্র ৪৮ ঘন্টার  মধ্যে মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অভিযান সফল করতে পিবিআই বরিশাল জেলা, পিবিআই সদর দপ্তর, ঢাকা ও বরিশাল নৌ পুলিশ এবং বরিশাল মহানগর পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেছে। গ্রেপ্তার আলম হোসেনকে বৃহস্পতিবার আদালতে সোপর্দ করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। মামলার অপর আসামি জাহানারা বেগমকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পিবিআই জানিয়েছে, তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

সিয়াম সরিষা
Link copied!