মৌলভীবাজারের শেরপুর, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্নে যেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তিন জেলার সংযোগস্থল, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের এই গুরুত্বপূর্ণ মোহনাস্থল একসময় ছিল যুদ্ধের উত্তাল স্মৃতিবাহী এক ঐতিহাসিক প্রান্তর।
২০০৪ সালে ‘প্রজন্ম ৭১’ ও ‘স্পন্দন থিয়েটার’ নামের দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠন শেরপুর বাজারের গোলচত্বরকে “মুক্তিযোদ্ধা চত্বর” ঘোষণার দাবি তোলে। দীর্ঘ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের অর্থায়নে এখানে নির্মাণ করা হয় একটি মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যাদের স্মরণে এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, সেই বীর শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম-পরিচয় কোথাও লিপিবদ্ধ করা হয়নি। ফলে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এখানে যেন অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
নির্মাণের পর স্মৃতিস্তম্ভটির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল একটি দৃষ্টিনন্দন পানির ফোয়ারা। নানা রঙের পানির ঝর্ণাধারা পথচারীদের দৃষ্টি কাড়ত, এনে দিত এক অন্যরকম সৌন্দর্য। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই ফোয়ারা আজ নিস্তব্ধ। নির্মাণের কিছুদিন পরই এটি বন্ধ হয়ে যায়, আর কখনো সচল করা হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের অবহেলায় স্মৃতিস্তম্ভটির চারপাশের স্টিলের বেষ্টনী ভেঙে গেছে। ফুটপাতের ব্লক উঠে গেছে বিভিন্ন স্থানে। চারপাশে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। দিনের আলো ফুরোলেই সন্ধ্যার পর এখানে জমে ওঠে বখাটেদের আড্ডা, যা এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে।
প্রতি বছর ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস, এপ্রিলের প্রথম ও শেষাংশ, এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের আগে স্মৃতিস্তম্ভটি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। কিন্তু দিবস শেষ হলেই আবার তা পড়ে থাকে অবহেলায়—যেন কোনো অভিভাবক নেই এই ইতিহাসের স্মারকের।
শ্রীহট্ট সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন সেলিম বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত জায়গায় স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সারা বছর এর কোনো দেখভাল নেই। শুধু বিশেষ দিনে পরিষ্কার করা হয়। বাকি সময় এটি অবহেলিত থাকে। দ্রুত সংরক্ষণ দরকার।”
প্রবীণ গণমাধ্যমকর্মী ও শ্রীহট্ট সাহিত্য সংসদের সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, “ঐতিহাসিক শেরপুর যুদ্ধ একসময় দেশ-বিদেশে আলোড়ন তুলেছিল। সেই স্মৃতিকে ধারণ করতে এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও আজ তা ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে আছে। সংশ্লিষ্টদের দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।”
শেরপুরের এই স্মৃতিস্তম্ভ শুধু একটি স্থাপনা নয়—এটি স্বাধীনতার ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। তাই প্রয়োজন—শহীদদের নাম ও পরিচয় সংরক্ষণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, পর্যটন ও ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে উন্নয়ন। নচেৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাবে এক গৌরবময় ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষী।
আপনার মতামত লিখুন :