মানিকগঞ্জের দৌলতপুর ও ঘিওর উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২ কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দের বক্স কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে দুই অর্থবছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ শেষ করা হয়নি। উপরন্তু নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, সরকারি তথ্য গোপন এবং তদন্তের নামে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্ষার পানিতে তড়িঘড়ি করে জোড়াতালির কাজ চলায় কোটি টাকার এই সরকারি প্রকল্প এখন স্থানীয়দের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় দৌলতপুর উপজেলার ৪টি এবং ঘিওর উপজেলার ২টি বক্স কালভার্ট নির্মাণে মোট ২ কোটি ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫৭ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কাজ শুরু করা 'মেসার্স ইয়াশা এন্টারপ্রাইজ' নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুন মাসের শেষ দিনেও অধিকাংশ কাজ অসম্পন্ন রেখেছে।
দুর্নীতির কৌশল হিসেবে বিভিন্ন প্রকল্প এলাকায় টাঙানো সাইনবোর্ডে প্রতিটি কালভার্টের পৃথক ব্যয় আড়াল করে সব প্রকল্পের মোট বরাদ্দ একসঙ্গে প্রদর্শন করা হচ্ছে। এতে জনগণের চোখ ফাঁকি দিয়ে অর্থ আত্মসাতের পথ সুগম করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই দুর্নীতির নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক প্রভাবশালী কর্মচারী। আইনি জটিলতা এড়াতে তিনি নিজের স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স (মেসার্স ইয়াশা এন্টারপ্রাইজ) নেন এবং বেনামে অংশীদার হিসেবে মাসুদ, মিজান ও আমিনুরকে নিয়োগ করে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লুটপাট করে আসছেন। এর আগে বানিয়াঘোনা এলাকায় প্রায় ৩৪ লাখ টাকার আরেকটি কালভার্ট প্রকল্পেও এই সিন্ডিকেটের দুর্নীতির খবর জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও রহস্যজনকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে প্রকল্পগুলোতে কোনো টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন ছাড়াই নিম্নমানের ও নম্বরবিহীন বড় আকারের পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প এলাকায় পিআইও অফিসের প্রকৌশলী বা তদারকি কর্মকর্তার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হলেও সরেজমিনে কাউকে পাওয়া যায়নি। ধামশ্বর ইউনিয়নের বৈরাগী এলাকায় কোনো সেচ ছাড়াই পানির মধ্যে তড়িঘড়ি করে ঢালাই ও গাঁথুনির কাজ চালানো হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। টেপরি এলাকায় তিন বছর আগের কাজ এখন বর্ষায় এসে রাস্তা কেটে ফেলে রাখায় চরম জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং সম্প্রতি দুই শিক্ষার্থী পানিতে পড়ে মৃত্যুর মুখ থেকে辛কষ্টে ফিরে এসেছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মাসুদ দুর্নীতি ও কাজে বিলম্বের দায় অংশীদারদের ওপর চাপিয়েছেন। অংশীদার মিজান দুর্নীতির প্রশ্নে ফোন কেটে দেন এবং অপর অংশীদার আমিনুর রহমান দৌলতপুর উপজেলার পিআইও কর্মকর্তার দোহাই দিয়ে বলে বেড়াচ্ছেন শত নিউজ হলেও কোনো অসুবিধা নেই। দৌলতপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) প্রকৌশলী মো. মহসিন উল-হাসান কেবল "বিল আটকে রাখা হয়েছে" বলেই দায় সারছেন। মানিকগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান "জুন মাস শেষে তদন্ত শুরু হবে" বলে কালক্ষেপণের বিষয়টি কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন। এদিকে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিয়ান নূরেন এবং জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী এস. এম. লুৎফর রহমান তাদের সরকারি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এটি কেবল উন্নয়ন কাজের ধীরগতি নয়, বরং প্রশাসনের নাকের ডগায় সরকারি কর্মচারীর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রকাশ্য দুর্নীতি ও লুটপাট। তারা অবিলম্বে এই নিম্নমানের কাজ বন্ধ করে নিরপেক্ষ বিচারিক তদন্তের মাধ্যমে ঠিকাদার সিন্ডিকেট ও তাদের মদদদাতাদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :