ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অস্ত্রের মহড়ার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার সাংবাদিক শরীফ ওমর টুটুলকে ঘিরে এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে সাড়ে ৫ বছরের পুরোনো একটি মাদক মামলার ছবি। টুটুলের অভিযোগ, সাম্প্রতিক হামলার মামলা থেকে দৃষ্টি সরানো ও তার সামাজিক ও পেশাগত চরিত্রহননের উদ্দেশ্যেই একটি মহল পরিকল্পিতভাবে পুরোনো ছবি নতুন করে ফেসবুকে ছড়িয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এসব ছবি যারা আপলোড ও প্রচার করছেন, তাদের শনাক্ত করে প্রচলিত সাইবার আইনে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
গত ১৩ আগস্ট গাজীপুর মহানগরের গাছা থানা এলাকায় ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অস্ত্রের মহড়ার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন প্রতিদিনের কাগজের মহানগর প্রতিনিধি শরীফ ওমর টুটুল। অভিযোগ, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। এ ঘটনায় টুটুল বাদী হয়ে গাছা থানায় ৯ জনের নাম উল্লেখসহ আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তার দাবি, মামলা হওয়ার পর থেকেই হামলার মূল ঘটনা থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে একটি মহল সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি একটি মাদক মামলায় র্যাব (১) এর হাতে আটকের সময় তোলা ছবি প্রায় সাড়ে ৫ বছর পর নতুন করে ফেসবুকে ছড়ানো হচ্ছে। এই মামলায় টুটুলের সম্পৃক্ত নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী। টুটুলের অভিযোগ, পুরোনো ছবিটি এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যেন বিচারাধীন ওই মামলায় আদালত তাকে ইতোমধ্যে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। অথচ মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।তিনি বলেন, “আমার চরিত্রহননের লক্ষ্যেই একটি মহল পরিকল্পিতভাবে ফেসবুকে সাড়ে ৫বছরের পুরোনো ছবি আপলোড ও ছড়িয়ে দিচ্ছে। কারা এসব করছে, তাদের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছি। যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছবি ছড়িয়ে আমাকে সামাজিক ও পেশাগতভাবে হেয় করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত সাইবার আইনে মামলা করব।”
টুটুল আরও বলেন, “আমি অপরাধী হলে আদালত আমার বিচার করবেন। কিন্তু আদালতের রায়ের আগেই পুরোনো ছবি ছড়িয়ে আমাকে অপরাধী বানানোর চেষ্টা কেন? আমার ওপর হামলার পরই কেন সাড়ে ৫বছরের পুরোনো ছবি সামনে আনা হলো—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।” ২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারির ঘটনা সম্পর্কে টুটুলের দাবি, ওই মাদক মামলায় তাকে পরিকল্পিতভাবে জড়ানো হয়েছিল। সেদিন প্রথমে তার ছোট ভাই শাহরিয়ার ফারুক গৌরবকে আটক করা হয়। পরে তাকে ফোন করে ডেকে নেওয়া হয়। টুটুল বলেন, “সেদিন আমি দৈনিক যুগান্তরের সাংবাদিক মো. আখতার হোসেনের সঙ্গে পূবাইল এলাকায় ছিলাম। আমার ছোট ভাইকে আগেই আটক করা হয়েছিল। এরপর আমাকে ফোন করে ডাকা হয়। আখতার ভাই আমাকে বারবার সেখানে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু আমি তার কথা শুনিনি।
টুটুল বলেন, “আমি কোনো মাদকের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমার নামে মাদকসংক্রান্ত কোনো অভিযোগও ছিল না। তাই ভয় পাওয়ার কোনো কারণ দেখিনি। নিজের সততা ও নির্দোষিতার ওপর বিশ্বাস রেখে সৎসাহস দেখিয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সাহস দেখাতে গিয়েই আমি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি।” তার দাবি, মো. আখতার হোসেনের সামনে থাকা অবস্থাতেই তিনি ফোনটি পান। সেখান থেকে যাওয়ার পর তাকে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয় ও পরে একই মাদক মামলায় আসামি করা হয়।
ছোট ভাইকে ফেরাতে একাধিকবার রিহ্যাবে--টুটুল ও তার পরিবারের ভাষ্য, ছোট ভাই শাহরিয়ার ফারুক গৌরবের মাদকাসক্তি ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন নিয়ে পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় ছিল। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে তিন থেকে চারবার মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছেও তাকে তুলে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি পরিবারের। পরিবারের বক্তব্য, ছোট ভাইয়ের মাদকাসক্তির সঙ্গে টুটুলের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। বরং পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো তিনিও তাকে মাদক থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন।
টুটুল বলেন, “আমার ছোট ভাইয়ের সমস্যা ছিল, এটা আমরা কখনো লুকাইনি। তাকে রিহ্যাবে দিয়েছি, প্রয়োজনে পুলিশের কাছেও দিয়েছি। কিন্তু তার কর্মকাণ্ডের দায় আমার ওপর চাপিয়ে আমাকে মাদকের সঙ্গে জড়িত হিসেবে প্রচার করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
পুরোনো মামলায় মোশাররফকে ঘিরে অভিযোগ: ২০২১ সালের ওই মামলা নিয়ে তৎকালীন গাছা থানার এসআই মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলেছেন টুটুল ও তার পরিবার। তাদের দাবি, টুটুলকে ওই মামলায় জড়ানো এবং পরবর্তী সময়ে অভিযোগপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে মোশাররফের ভূমিকা ছিল।
টুটুলের অভিযোগ, তৎকালীন পুলিশের একটি অংশ তাকে ভালো চোখে দেখত না। সেই বিরোধকে কাজে লাগিয়ে ছোট ভাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকেও মাদক মামলায় জড়ানো হয়। টুটুলপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে কলেজছাত্র হৃদয় নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলায় পরবর্তী সময়ে এসআই মোশাররফ হোসেন গ্রেপ্তার হন। তাদের দাবি, হৃদয়ের ফুফাতো ভাই মো. ইব্রাহীম ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট কোনাবাড়ী থানায় হত্যা মামলাটি করেন। একই হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও পৃথক মামলা রয়েছে।
২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট—সময় পেরিয়েছে প্রায় সাড়ে ৫বছর। ফলে টুটুল ও তার সহকর্মীদের প্রশ্ন?এতদিন পর ও বিশেষ করে তার ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হওয়ার পরপরই পুরোনো ছবিটি কেন নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে?টুটুল বলেন, “সেই সময় আমাকে ফোন করে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। আটকের সময়ের ছবি এখন এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যেন আদালত আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। অথচ মামলাটি এখনো বিচারাধীন। যারা এসব করছে, তাদের উদ্দেশ্য নিয়েই আমার প্রশ্ন।” তার অভিযোগ, হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার পাশাপাশি তার সাংবাদিকতা, সামাজিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করতেই পুরোনো ছবি সামনে আনা হয়েছে।
টুটুল ও তার পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের মাদক মামলাটি এখনো আদালতে বিচারাধীন। আগামী নভেম্বরে মামলাটিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে তারা জানিয়েছেন।তাদের বক্তব্য, আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটিই তারা মেনে নেবেন। তবে আদালতের সিদ্ধান্তের আগে পুরোনো ছবি ব্যবহার করে কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।কোনো মামলায় অভিযুক্ত হওয়া ও আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক বিষয় নয়। ফলে বিচারিক নিষ্পত্তির আগে মামলার অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে প্রচার না করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকের মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও সেই ঘটনায় মামলা, অন্যদিকে মামলা দায়েরের পর সাড়ে ৫বছরের পুরোনো বিচারাধীন মামলার ছবি নতুন করে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া—দুই ঘটনাকে ঘিরেই এখন প্রশ্ন উঠেছে। টুটুলের ভাষ্য, “২০২১ সালের মামলার সত্য-মিথ্যা আদালতেই নির্ধারণ হোক। আমি আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে নেব। কিন্তু সেই মামলার পুরোনো ছবি ব্যবহার করে আমার ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাকে আড়াল করা কিংবা আমাকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা মেনে নেব না। যারা ফেসবুকে পরিকল্পিতভাবে আমার চরিত্রহনন করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।
টুটুল ও তার সহকর্মীদের প্রশ্ন—কারা সাড়ে ৫ বছরের পুরোনো ছবিগুলো নতুন করে ছড়াচ্ছে, কেন ঠিক এই সময়ে ছড়ানো হচ্ছে এবং এর পেছনে সাম্প্রতিক হামলার মামলাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না? তাদের দাবি, পুরোনো মামলার বিচার আদালতে চলুক, কিন্তু তার আড়ালে যেন ১৩ আগস্ট একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা চাপা না পড়ে। একই সঙ্গে পুরোনো ছবি ব্যবহার করে পরিকল্পিত অপপ্রচার বা চরিত্রহনন হয়ে থাকলে সেটিও তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক।

আপনার মতামত লিখুন :